ইন্টিগ্রেশন-এর কম বেশি

এই সমস্যাটা ভারতীয় স্ট্যাটিসটিক্যাল সংস্থার প্রবেশিকায় দেখেছিলাম। ইন্টিগ্রেশন (সমাকলন) ব্যাপারটা আদতে কি, সেটুকু জানলেই অঙ্কটা করে ফেলা যায়।

$$ \int_3^5 \frac{1}{1+x^3} dx $$

প্রমাণ করতে হবে যে এই ইন্টিগ্রালটার মান $ \frac{1}{63}$-বেশি, কিন্তু $ \frac{1}{14}$-র চেয়ে কম।

মজার ব্যাপার হলো, অঙ্কটা কষতে, ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাসের কোন ফর্মুলা না জানলে দিব্যি চলবে।

ব্যাপারটা বুঝতে একটু ছবি আঁকা যাক। ধরো x-y সমতলে একটা কার্ভ এঁকেছি। কার্ভটা x= -১ (নীল দাগ) থেকে x = +১ (লাল দাগ) অবধি দেখছি। বাকিটা মনে মনে মুছে দিতে পারো। কার্ভটার ফাংশন ধরা যাক g(x)।

এবার একটু ভাবো।

$$ \int_{-1}^1 g(x) $$

এই ইন্টিগ্র্যাল আসলে কি?

এটা হলো কার্ভটার তলায় যেটুকু জায়গা আছে তার ক্ষেত্রফল।

আমরা এই নীল জায়গাটার মাপ বুঝতে চাই। এটা ঠিক কতটা বড় হতে পারে? এটা কতটা ছোটো হতে পারে?

কার্ভটা একটা জায়গায় পাহাড়-এর মত উঠেছে। শিখরে পৌঁছেছে। এই শিখরের উচ্চতা যতটা ততটা দিয়ে যদি দৈর্ঘ্যকে গুণ করে দিতে পারি তাহলে এমন একটা চতুষ্কোণের ক্ষেত্রফল পাবো যা নীল ক্ষেত্রফলের চেয়ে নিঃসন্দেহে বড়। অর্থাৎ M যদি উচ্চতা হয়, a এবং b যদি x-axis ওপর আগা এবং মাথা হয় (যেখান থেকে যত অবধি ইন্টিগ্রাল নিচ্ছি) তাহলে,

$$ \int_{a}^b g(x) \leq M \times (b-a) $$

$ M \times (b-a) $ হচ্ছে সবুজ চতুষ্কোণের ক্ষেত্রফল। $ \int_{a}^b g(x) $ হচ্ছে কার্ভের নীচে নীল অঞ্চলটারও ক্ষেত্রফল।

যেমন করে আমরা শিখরকে ব্যবহার করেছি, তেমন করে আমরা g(x) -এর সর্বনিম্ন মান-কে ব্যবহার করতে পারি।

যদি ফাংশনের সর্বনিম্ন মান m হয় তাহলে, $$ m \times (b-a) \leq \int_{a}^b g(x) $$। ছবিতে $ m \times (b-a) $ হচ্ছে লাল চতুষ্কোণের ক্ষেত্রফল। লাল অবশ্যই নীলের চেয়ে ছোটো।

এবার আমরা এই ইন্টিগ্র্যালটার একটা মাপ পাবো।

$$ \int_3^5 \frac{1}{1+x^3} dx $$

তিন থেকে পাঁচের মধ্যে $ \frac{1}{1+x^3}$ সবচে ছোটো যখন $ x = 5 $। এখানে $m = \frac{1}{1+5^3} = \frac{1}{126}$। আবার $ \frac{1}{1+x^3}$ সবচে বড় যখন $ x = 3 $। এখানে $M = \frac{1}{1+3^3} = \frac{1}{28}$।

অতএব

$$ m \times (b-a) \leq \int_3^5 \frac{1}{1+x^3} dx \leq M \times (b-a) $$

$$ \frac{1}{126} \times (5-3) \leq \int_3^5 \frac{1}{1+x^3} dx \leq \frac{1}{28} \times (5-3) $$

অতএব প্রমাণিত হলো যে এই ইন্টিগ্রালটার মান $ \frac{1}{63}$-বেশি, কিন্তু $ \frac{1}{14}$-র চেয়ে কম।

পিয়ানোর চতুষ্কোণ, তাতে ‘মাত্রা’ হলো মাত্রাছাড়া!

(২১-শে ফেব্রুয়ারীর প্রতি)

‘মাত্রা’ অথবা ডাইমেনশন কাকে বলে? একটু তলিয়ে ভাবতে গেলে কিন্তু সব গোলমাল হয়ে যায়। এই এক টুকরো লেখায়, আমরা ডাইমেনশন নিয়ে একটু ভাবা প্র্যাকটিস করব।

একটা বিন্দু-র dimension কি? একটা সরলরেখারই বা dimension কি? একটা কাগজের টুকরোর dimension কি হবে? চট করে ভাবলে মনে হয় যে

  1. বিন্দুর মাত্রা ০
  2. সরলরেখার মাত্রা ১
  3. সমতল কাগজের টুকরোটার মাত্রা ২

কিন্তু কেন এরকম মনে হচ্ছে? তুমি বলতে পারো যত গুলো সংখ্যা লাগে কোনো বিন্দুর ঠিকানা অথবা coordinate লিখতে, মাত্রাও ঠিক তত।

কাগজের টুকরো দ্বিমাত্রিক। প্রতিটা বিন্দুর ঠিকানা লেখার জন্য দুটো সংখ্যা দরকার।

বেশ। আরেকটু তলিয়ে ভাবা যাক।

একটা আঁকাবাঁকা রেখার মাত্রা (ডাইমেনশন) কি হবে? যেমন ধরো এই ঢেউ-এর মত রেখাটার dimension কত ?

ঢেউ-এর মাত্রা কি হতে পারে?

তুমি বলবে, ‘এ তো মনে হচ্ছে একটা সুতো এঁকে বেঁকে পড়ে আছে। টান টান করে দিলেই সরলরেখা হয়ে যাবে। অতএব-এর মাত্রা নির্ঘাত ১।’

যদি এই যুক্তিটা মানতে পারো, তাহলে কিন্তু মুশকিলের দিকে এক পা বাড়িয়ে দিলাম। যুক্তিটা আরেকটু স্পষ্ট করে বললে দাঁড়াচ্ছে এরকমঃ

একটা সরলরেখাকে (সুতোকে) ঘুরিয়ে বাঁকিয়ে যা যা বানানো যায়, তাই ১-মাত্রিক।

মুশকিলটা করলেন ইতালিয় গণিতজ্ঞ জিয়োসিপ্পে পিয়ানো। ১৮৯০ সাল নাগাদ তিনি প্রমাণ করে ফেললেন যে একটা সুতোকে ঘুরিয়ে বাঁকিয়ে একটা গোটা কাগজের টুকরো ভরাট করে ফেলা যায়!

পিয়ানো ভরলেন চতুষ্কোণ

পিয়ানোর কায়দাটা খানিকটা এরকম।

প্রথম ধাপ
দ্বিতীয় ধাপ
রক্তবীজের মত সে বেড়ে উঠছে

তাহলে কি কাগজের টুকরো একমাত্রিক? একমাত্রিক সুতোকে বাঁকিয়ে ঘুরিয়ে তাকে ভরাট করে ফেলা যাচ্ছে যে!

এবার কি হবে?

পরের পর্বে সে নিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।

Really understanding Direct Limit, Inverse Limit, and Hom

Direct Limit, Inverse Limit, and Hom are three ideas from category theory that are useful in many branches of mathematics. A deep understanding of them can be very helpful in the long run.

In the following video, we draw schematic pictures and gain real intuition behind these abstract ideas. This is clearly one of the most important videos of our production.

দুনিয়া যদি হয় হাইপারবোলিক!

হাইপারবোলিক জ্যামিতির জগৎটা একদমই অন্যরকম। এখানে ইউক্লিড খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। এখানে সমান্তরাল রেখা মিশে যায়। এখানে সরলরেখা দেখায় আঁকা বাঁকা।

আমরা হাইপারবোলিক জ্যামিতির দুনিয়াটাকে দেখে নেবো, গণিতের আয়নায়।

প্রথম পর্বঃ হাইপারবোলিক জ্যামিতি কাকে বলে?

দ্বিতীয় পর্বঃ হাইপারবোলিক মেট্রিক কি?

তৃতীয় পর্বঃ হাইপারবোলিক সরলরেখা আঁকা যাক

পরের পর্ব দেখার জন্য ইউটিউব চ্যানেল দেখতে থাকুন।

বিস্মৃতপ্রায় তিন বাঙালি গণিতজ্ঞ এবং একটি পরিশিষ্ট

২১শে ফেব্রুয়ারী দিনটা বড় আবেগের- মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস । প্রত্যেক মানুষের মনেই নিজের মাতৃভাষার জন্যে আলাদা একটি জায়গা আছে , তা তিনি যতই কর্মসূত্রে প্রবাসী বা ভিনদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে থাকুন না কেন !

বাঙালির একটা নিজস্ব মিষ্টি অভিযোগ আছে, যে গড়পরতা বাঙালি অঙ্ককে ভয় পায় এবং সে বিজ্ঞান বা অঙ্কের চেয়ে সাহিত্য, শিল্পকর্মে বেশি দক্ষ । যদিও বা বিজ্ঞান ,অঙ্ক নিয়ে কথা ওঠে , তখন আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু হয়ে প্রশান্ত চন্দ্র মহালানবিসে এসে থেমে যায় ।
আমরা এই লেখাটিতে তিনজন বাঙালি গণিতজ্ঞর কথা বলব , যাদেরকে আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি।

আপনাদের কাছে আমার বিশেষ আবেদন, বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি গণিতজ্ঞ এবং তাঁদের গাণিতিক কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে যদি কিছু জেনে থাকেন তাহলে অবশ্যই জানাবেন। আমি সময় হিসাবে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষকে বেছে নিয়েছি।

রাধানাথ শিকদার (১৮১৩ খ্রিঃ - ১৮৭০ খ্রিঃ)

রাধানাথ শিকদার-নামটার সাথে আমাদের এক লাইনের পরিচয় ভূগোল বইয়ে- প্রথম মানুষ যিনি মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা পরিমাপ করেছিলেন ।
সময়টা ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ , তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল জর্জ এভারেস্ট 'গ্রেট ত্রিগোনমেট্রিক সার্ভে'-র জন্য দক্ষিণ ভারত থেকে নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত দ্রাঘিমাংশীয় চাপের সঠিক পরিমাপ করতে চাইছিলেন অর্থাৎ বর্তমান গণিতের ভাষায় জিওডেসিকের আকার জানতে চাইছিলেন । আর এই কাজের জন্যে বক্রতলসংক্রান্ত জ্যামিতি এবং গোলকীয় ত্রিকোণমিতি জানা এক গণিতজ্ঞ প্রয়োজন ছিল । তিনি শরণাপন্ন হলেন কলকাতার হিন্দু কলেজের (বর্তমানের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) গণিতের অধ্যাপক জন টাইটালারের । জন টাইটালার ভাবলেন, তাঁর প্রিয়তম ছাত্র - নিউটনের 'প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা', ইউক্লিডের 'এলিমেন্ট' , টাইকো ব্রাহে, কেপলার পড়া রাধানাথের কথা । রাধানাথ ওই সময়েই দুটি বৃত্তের উপর স্পর্শক আঁকবার পদ্ধতি নিয়ে গবেষনাপত্র প্রকাশ করেছিলেন । কাজে যোগ দেবার পর নিজের বক্রতলসংক্রান্ত জ্যামিতিক জ্ঞানকে আরও শানিয়ে তুললেন ।
১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে জর্জ এভারেস্টের উত্তরসূরি কর্নেল অ্যান্দ্রু স্কট ওয়া'র অধীনে হিমালয় পর্বতমালার XV শৃ্ঙ্গটির ছ'টি রিডিং পর্যবেক্ষণ করেন । ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান XV শৃ্ঙ্গটি , পুরানো মাপ অনুযায়ী সর্বোচ্চ শৃ্ঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়েও উঁচু -২৯,০০০ ফুট ।
এই XV শৃ্ঙ্গটির নামকরণ হয় জর্জ এভারেস্টের নাম অনুসারে- আর রাজশক্তির 'বদ্যানতায়' উপেক্ষিত থেকে যান রাধানাথ শিকদার, সঙ্গে উপেক্ষিত হয় তাঁর সমস্ত গাণিতিক কর্মাবলী ।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় (১৮৬৪ খ্রিঃ-১৯২৪ খ্রিঃ)

বাংলার বাঘ- শুনলেই মনে আসে একটি নাম, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় । আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ ।
শিক্ষাবিদ, দক্ষ প্রশাসক , আইনজীবী - এই সব পরিচয়ের মাঝে যেন হারিয়ে গেছেন গণিতজ্ঞ আশুতোষ মুখোপাধ্যায় । স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রথাকাকালীনই ইউক্লিডের বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট'র ২৫তম বিবৃত্তির একটি অন্য ধরণের প্রমাণ প্রকাশ করেন । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পরীক্ষায় গণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন এবং পরের বছর, ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে পদার্থবিদ্যায় এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ওই বছরই উপবৃত্তীয় অপেক্ষকের উপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন । এই কাজটির জন্যে বিখ্যাত ইংরেজ গণিতজ্ঞ আর্থার কেলি ভূয়সী প্রশংসা করেন । মাত্র ২২ বছর বয়সে এডিনবরার রয়্যাল সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন । এছাড়াও পিলার্ম​ ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটি, লন্ডন ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটি সহ এই ধরণের বহু সঙ্ঘ-সমিতির সদস্যপদ লাভ করেছিলেন । তিনিই প্রথম গণিতজ্ঞ যিনি ত্রিমাত্রিক অন্তরকলজের জ্যামিতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছিলেন । গণিতজ্ঞ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত অবদান হল - সমনাভিবিশিষ্ট উপবৃত্তগুলির দ্বারা তৈরি একটি সিস্টেমেরএ(উদাঃ সৌরজগৎ) আবক্র পথ নির্ণয় সংক্রান্ত গবেষণা । এছাড়াও তাঁর ডিফারেনসিয়াল জ্যামিতিতে অবদান এবং ক্যালকাটা ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটি র প্রতিষ্ঠা বিশেষ উল্লেখযোগ্য ।
এখানে একটা কথা না বলে থাকা যায় না, সেটি হল বাংলাভাষার জন্য নিরলস সংগ্রাম । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'আশুতোষ মিউজয়ম অব আর্টস' হলে ওনার ব্রোঞ্জমূর্তির নিচে লেখা কথাটি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ।
"His noblest achievement, surest of them all/ A place for his mother tongue - in step mother's hall."

বিভূতিভূষণ দত্ত (১৮৮৮ খ্রিঃ - ১৯৫৮ খ্রিঃ )

ভারতীয় গণিতের ইতিহাস নিয়ে যখন কথা ওঠে, তখন সবচেয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসাবে উঠে আসে একটি নাম "History of Hindu Mathematics: A Source Book"। এই বইটির সাথে জড়িত আছে আর এক বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি গণিতজ্ঞ - বিভূতিভূষণ দত্ত ।

ছোট থেকেই ছিলেন সন্ন্যাসীমনোভাবাপন্ন । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ পড়াকালীন পরীক্ষার আগে হরিদ্বার চলে গিয়েছিলেন সন্ন্যাস নেবেন বলে । সেখান থেকে ফিরে
এম. এ-তে অসম্ভব ভালো ফলাফল করেছিলেন । তিনি কাজ করেছেন মুলত ফলিত গণিত নিয়ে । ১৯১০-১২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ক্যালকাটা ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল স্থিতিস্থাপকতা তত্ত্ব এবং ঘূর্ণিয়মাণ তরলের ভর নিয়ে লেখা দু'টি গবেষনাপত্র । হাইড্রোডাইনামিক্স বা উদগতিবিদ্যা নিয়ে প্রকাশ করেছেন অনেকগুলি গবেষনাপত্র ।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সময়, শাল্ব-সুত্রের উপর লেখা প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই । ১৯৩৩ খ্রিঃ তিনি History of Hindu Mathematics তিন খণ্ডের পাণ্ডুলিপি অনুজ সহকর্মী এ.এন. সিংহের তুলে দেন । যেগুলি প্রকাশিত হবার পর হয়ে ওঠে ভারতীয় গণিতের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ । তিনি শেষজীবনে পুরোপুরিভাবে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেছিলেন ।

পরিশিষ্ট

এখানে একটা প্রশ্ন প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে আসে- ওনারা তো সমস্ত কাজটাই ইংরেজি ভাষাতে করেছেন তো বাংলাভাষায় গণিতচর্চায় এদের অবদান কোথায় ?
এর উত্তরে আমি বলব- ওনারা আমাদের অনবরত সাহস জুগিয়ে চলেছেন যে, বাঙালি গণিতশাস্ত্রেও শিল্প সাহিত্যের মতনই পারদর্শী হতে পারে ।
বাংলাভাষায় গণিতচর্চার কথাই যখন উঠল, তখন বলি বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ নামের অঙ্গরাজ্য অথবা বহুদিন ধরে প্রবাসে থাকা বাঙালিই হোক - তাদের মধ্যে মরমী কিছু মানুষ অবিরাম চেষ্টা করে চলেছেন । শুধু তাদের চেষ্টাই যথেষ্ট নয় , এগিয়ে আসুন আপনিও ।
শেষ করি প্রতুল চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ও গাওয়া গানের অংশবিশেষ দিয়ে এবং স্বপ্নদেখি বাংলাভাষায় গণিতচর্চার।

আমি যা’কিছু মহান বরণ করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়
মেশে তেরো নদী সাত সাগরের জল গঙ্গায় পদ্মায়
বাংলা আমার তৃষ্ণার জল তৃপ্ত শেষ চুমুক
আমি একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ |


ঋণস্বীকার : লেখার সাহস যোগানোর জন্য অশনি দাসগুপ্ত স্যার, সৃজিত মুখার্জ্জী এবং ক্রমাগত উৎসাহ দেবার জন্যে বন্ধু শুভজ্যোতি মজুমদারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ ।

কল্পনার গোল্লাছুটে যুক্তির দরবেশ!

International Mother Language Day special... and excursion in mathematical reason and imagination 

শোভাবাজারের মিত্র কাফেতে গিয়ে বসলাম। 'একটা পরোটা মাটন দিন দাদা'।

সময়টা ১৯৭৬ এর ফেব্রুয়ারি মাস। বাইরে তখনো একটু শীত শীত ভাব। হাতা গুটিয়ে পরোটায় হাত লাগাতে যাবো! এমনি সময় মোবাইলটা ট্যাঁ ট্যাঁ করতে শুরু করল।

মন দিয়ে পাঁঠা খাবো তার জো নেই এই দুনিয়ায়! নিউইয়র্ক থেকে সুমন্ত্র ফোন করছে।

ওখানে ও বছরখানেক হল রাজমিস্ত্রির কাজ করছে। বেশ টাকাও করে ফেলেছে। শনিবার রাত হলেই প্রচুর মদ্যপান করে। আর ফোন লাগায়। টাকা দিয়ে তো আর একাকীত্ত্ব ঘোচানো সম্ভব নয়।

'কি ভাই ইন্দিরা গান্ধী কি বলছে?'

ভিডিও কল। স্কাইপে। বুঝলাম পুরো খেজুর করার মুডে আছে খোকা।

'দুত্তোর ইন্দিরা গান্ধী! এখন তো সঞ্জয় গান্ধীর যুগ। সদ্য ভবিষ্যৎএর ভুতের প্রিন্ট গুলো ন্যানোর কারখানায় গিয়ে পুড়িয়ে এসেছেন জুনিয়ার গান্ধী।'

মিত্র কাফের লোকজন ততক্ষণে আমার দিকে এগিয়ে এসেছে।

' দাদা আপনার হাতের তেলোয় ও কি? কাঁচের মধ্যে দিয়ে আরেকটা মানুষ দেখা যাচ্ছে যে।'

আমি পাঁঠার টুকরো মুখে পুরতে পুরতে প্রফেটিক হাসি হাসলাম, ' Any sufficiently advanced technology is indistinguishable from magic.'

আর্থার সি ক্লার্ক বলেছিলেন সেই কবে। তারপর এই আমি বল্লাম।

পরের দিন দৈনিক যুগান্তরে হেডলাইন হল,

'উত্তর কলকাতায় কাঁচের মধ্যে দিয়ে দশ হাজার মাইল দূরের মানুষের সহিত কথা বলা যাইতেছে'

যথেষ্ট উন্নতমানের প্রযুক্তি খানিকটা ম্যাজিকের মত। আমরা ব্যবহার করতে করতে ভুলে যাই যে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও এ সমস্ত অকল্পনীয় ছিল।

নিবিড় গণিতও খানিকটা ম্যাজিকের মত। তবে তাকে মনের চোখ দিয়ে দেখতে হয়। আমি গণিত করতে করতে এমন অনেক সত্যের মুখোমুখি হয়েছি , যা কল্পনাতেও আনা শক্ত। এ অনেকটা চাঁদের পাহাড়ের শঙ্করের মত। অনেক খাটাখাটনি করলে তবে পৌঁছনো যাবে সেই দেশে। একবার পৌঁছতে পারলে মনের চোখ ধাঁধিয়ে যাবে নির্ঘাত!

এরকম দু একটা অকল্পনীয় কল্পনার গল্প করতে বসেছি আজ।

যারা অঙ্ক বিন্দুমাত্র জানেন না, জানতে চান না, তাদেরও এই অবিশ্বাস্য যুক্তির মায়ার খেলা শুনতে ভালো লাগতে পারে।

১। অসীম অসংখ্য! (ক্যান্টর)

ক্যান্টর বললেন অসীম ব্যাপারটা কোনো একটা ব্যাপার নয়!

রবি ঠাকুর যখন গেয়ে ওঠেন, 'তোমার অসীমে প্রাণ মনে লয়ে', আমরা বুঝি অসীম ব্যাপারটা মস্ত ব্যাপার! একটা না শেষ হওয়ার গল্প।

কিন্তু কখনো কি ভাবি যে অসীমেরও ছোটো - বড় হতে পারে?

সে আবার কেমন? অসীম তো অসীমই! তার মধ্যে আবার মাত্রা ভেদ আছে নাকি?

এমনই এক অকল্পনীয় গল্প শুনিয়েছিলেন ক্যান্টর। ততকালীন গণিতজ্ঞরাও তাকে পাগল বলেছিল। অথচ এখন গোটা দুনিয়াই তার তত্ত্ব মেনে নিয়েছে।

ব্যাপারটা কি?

ক্যান্টর বললেন 'কতজন লোক সিনেমা দেখছে বুঝবে কি করে? জনে জনে গুনতে পারো। কিন্তু সে খুব কঠিন কাজ। হয়ত তুমি গুনতে শুরু করলে, আর কয়েকজন বাথরুমে চলে গেল। কেউ হয়ত হল ছেড়ে চা-তেষ্টা মেটাতে দেউরিতে গেলো। এই হাঙ্গামার মধ্যে নিঁখুত ভাবে গুনবে কি করে?

এক কাজ করো।

টিকিট বইটা দেখে নাও।

ব্যাস! যতগুলো টিকিট বিক্রি হয়েছে ততজনই দেখতে ঢুকেছে।

গোনাগুনতির এই পদ্ধতিকে 'বাইজেকশন' বলে। দুটো সেটের মধ্যে একই সংখ্যক বস্তু আছে কিনা বুঝতে হলে, দুটো সেটকে এমন ভাবে মেলানো যাচ্ছে কিনা দেখতে হবে।

যদি যায় তবে কেল্লাফতে। দুটোর মধ্যেই একই সংখ্যক বস্তু আছে।

এবার ক্যান্টর বললেন, 'গোটা সংখ্যা (1, 2, 3, 4...) যে অসীম সে আমরা সবাই জানি। কিন্তু যত গুলো জোড় সংখ্যা (2, 4, 6, 8...) আছে, গোটা সংখ্যাও ঠিক ততগুলো'।

তুমি তো রেগে কাঁই!

'সে কেমন ভাবে হবে? বিজোড় গুলো বাদ গেল যে।'

ক্যান্টর বলবেন, 'ও ভাবে নয়। মিলিয়ে দেখো'।

কি করে? বেশ। যদি x একটা গোটা সংখ্যা হয়, তার সাথে মিলিয়ে দাও 2x কে! এবার দেখো একটা নিয়ম পেলে। প্রতিটা গোটা সংখ্যার জন্য একটা করে জোড় সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে।

কি অদ্ভুত! বিজোড় গুলো তবে গেল কই?

এই যে তোমারও অদ্ভুত লাগছে এটাই মজা! কল্পনা পৌঁছতে পারছে না। ইন্টিউশন ফেল মেরে দিচ্ছে। এই আঁধারে যষ্টি হল একমাত্র 'reason'!

ক্যান্টর আরেকটু এগিয়ে বল্লেন, 'গোটা সংখ্যার চেয়ে গুঁড়ো সংখ্যা (real numbers) নির্ঘাত বেশি।'

কেন বাপু? দুটোই অসীম।

ক্যান্টর স্রেফ যুক্তি দিয়ে বলে দিলেন যে সে দুটো সেটকে 'মিলিয়ে দেখার' কোনো নিয়ম খুঁজেই পাওয়া যাবে না।

মিলিয়ে দেখার কোনও একটা নিয়ম খুঁজে বার করা তুলনামূলক ভাবে সহজ কাজ। কিন্তু কখনোই কোনও নিয়ম পাওয়া যাবে না! এ বড় কঠিন প্রস্তাব।

ক্যান্টরের যুক্তি জালের কথা আর বললাম না এখানে। যদি তুমি এ লেখা পড়ে সেসব খোঁজার চেষ্টা করো তাহলে বেশ হয়।

২। রাস্তাগুলোই সীমান্ত (গ্রোমোভ)

ভারতের সীমান্ত কোথায়?

গ্রোমোভকে বললে একটা অদ্ভুত উত্তর পাবে। গ্রোমোভ বলবেন, 'যে কোনো জায়গা থেকে শুরু করো। যেমন নিশ্চিন্দিপুর।'

বেশ!

'সেখানে থেকে যে কটা সিধে রাস্তা বেড়িয়েছে, মনে মনে তাদের একজোট করো।'

'করলাম'।

ব্যাস। কাম শেষ। এই একজোটে যাদের পেলে তারাই সীমান্ত।

ধাঁধা লেগে যাবে এসমস্ত শুনতে। এমনও হয়?

গ্রোমোভ পরশুরাম সম ঔদাসীন্যে বলবেন, 'হয়,Zআনতি পার না'

নিশ্চিন্দিপুর থেকে নির্গত সোজা পথগুলো (geodesic rays) -কে দিয়ে একটা সেট (set) বানানো যায়। গ্রোমোভ যুক্তিজাল বিস্তার করে দেখিয়েছিলেন যে এই সেট-টা একদম space -এর সীমান্তের মতই। একধরণের বিশেষ জগৎ-এ (space-এ) এমনটা হয়। সে জগৎ-এর নাম হল Delta hyperbolic space।

সে কেমন জগৎ?

বড়ই অদ্ভুতুরে। সেখানে একটা লাইনের সমান্তরাল অসীম সংখ্যক লাইন আঁকা যায়। আরো জানতে হলে যুক্তির সেই সুন্দর বাগানে পৌঁছে যেতে হবে। তার জন্য খাটতেও হবে খুব।

৩। আমার পথ চলাতেই আনন্দ (মাধবাচার্য্য)

কেরল দেশের মাধবাচার্য্য বললেন, 'গন্তব্য বলে কিছু নেই বাপু। পথটাই গন্তব্য।'

সে আবার কেমনতর কথা?

ধরো তুমি গুটি গুটি পায়ে শ্যামবাজারের দিকে হাঁটা দিলে। প্রথম ঘন্টায় অর্ধেক পথ গেলে। দ্বিতীয় ঘন্টায় বাকি অর্ধেকের অর্ধেক গেলে। অর্থাৎ মোট পথের ১/৪ ভাগ গেলে। পরের ঘন্টায় তারও অর্ধেক গেলে। এমনি করে তোমার 'চলা' চলতে থাকল।

গ্রীক দার্শনিক Zeno এই নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু করেছিলেন। মাধবাচার্য্য অবশ্য সেসব ধার দিয়েও গেলেন না। উনি পষ্ট বললেন যে এই পথ চলাটাই হল শ্যামবাজার!

এমন করে ভাবতে গেলে সুবিধাই বা কি, অসুবিধাই বা কি?

আসলে এমনি ভাবে হাঁটতে গেলে অসীম সংখ্যক ঘন্টা কেটে যাবে (infinite sequence পাওয়া যাবে)। চলার ভঙ্গীটা যদি একটু বিশেষ ধরণের হয় তবে এই অসীম পদক্ষেপের মধ্যে নিহিত থাকবে একটি মাত্র গন্তব্য। এই যেমন একটু আগে বল্লাম। ঘন্টা যতই কাটুক, প্রতি ধাপে জড়িয়ে আছে শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার ইঙ্গিত!

এমন করে যে কোনো সসীম সংখ্যাকে অসীম সংখ্যার মালা হিসেবে ভাবা যায়। সংখ্যামালা হচ্ছে সেই পথ। আর সসীম সংখ্যাটি হল গন্তব্য।

যেমন ধরো ১।

১ যদি গন্তব্য হয়, তাহলে পথ হতে পারে 0.9, 0.99, 0.999, 0.9999... । এই সংখ্যামালায় অসীম সংখ্যক সংখ্যা আছে। কিন্তু উপান্তে দাঁড়িয়ে আছে ১!

কিন্তু এমন করে ভাবব কেন?

কারণ যদি উপান্তে কে আছে নাও জানা থাকে, পথটাকেই সেই গন্তব্যের প্রতীক বলে ভেবে নেওয়া যাবে। অর্থাৎ সেই অসীম সংখ্যামালা কে গন্তব্য-সংখ্যার সমতুল্য ভাবা যাবে।

মাধবাচার্য্য এমন অনেক পথ (অনেক infinite sequence) খুঁজে বার করেছিলেন যাদের উপান্তে যে সংখ্যারা দাঁড়িয়ে তাদের মানুষ ভালো করে চেনে না।

কিরকম।

একটা বৃত্ত আঁকো। বৃত্তের পরীসীমাকে তুমি বৃত্তের ব্যাসার্ধর নিরিখে মাপতে পারবে?

ব্যাসার্ধ সরল রেখা। মাপা যাবে। তার নিরিখে যদি বৃত্তের বাঁকা রেখা কে মাপা যায়, তাহলে বক্রতাকে সারল্য দিয়ে ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব!

'নিরিখে' মাপা যাবে মানে?

ধর ব্যাসার্ধকে দশ টুকরোতে ভাগ করলে। এই মাপের ষাটটা টুকরো নিলে। যদি বৃত্তের পরীসীমাকে টান টান করে দাও তবে তা এই ষাট টুকরোর চেয়ে একটু বড় হবে। বাষট্টি টুকরোর চেয়েও বড় হবে। কিন্তু ৬৩ টুকরোর চেয়ে ছোটো হবে।

তুমি আবার চেষ্টা করতে পারো। এই তেষট্টি তম টুকরোটাকে দশ ভাগে ভাগ করে, তার থেকে কতক গুলো নেওয়া যায়। কিন্তু আটটা নেওয়ার পর নয় নম্বরটা বসানো যাবে না। একটু কম হবে। আটের চেয়ে বেশি। নয়ের চেয়ে কম।

এমনি করে ক্রমাগত করে যেতে হবে। কিছুতেই শেষ হবে না মাপা।

মাধবাচার্য্য বললেন মাপার দরকার নেই। এই অসীম সংখ্যক মাপকেই পরীসীমার মাপ হিসেবে ধরতে হবে। এই অসীম সংখ্যামালাকেই গন্তব্য সংখ্যা হিসেবে কল্পনা করতে হবে।

চিন্তার জগৎ-এ এক বিপ্লব এসে পড়লো! সসীম সংখ্যাকে অসীম সংখ্যামালা হিসেবে ভাবতে হবে! এ যেন চরৈবেতি-র নতুন ব্যাখ্যা!

শেষ কথা

গণিত করতে করতে মনে হয় যে কল্পনা যেখানে থই খুঁজে পায় না, যুক্তি তাকে সেখানে পথ খুঁজতে সাহায্য করতে পারে। এ কথাটা সাধারণ ভাবে আমরা ভাবি না।

যুক্তিকে বড়ো কাঠখোট্টা ভদ্রলোকের মত মনে হয়। কল্পনা তার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকা এক অস্থির মতি বালিকা। সে যেন রেবা নদীর তীরে ছুটোছুটি করে খেলছে। আর যুক্তি তাকে বকাবকি করছে। শাসনে রাখতে চাইছে।

অথচ ব্যাপারটা হয়ত একটু অন্যরকম। হয়ত কল্পনা এক বৃত্তে ছুটে চলেছে। যুক্তি সেখানে এক দরবেশের মত এসে হাজির। সে তাকে নতুন পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে আরও উন্মুক্ত অস্থিরতায়।

আর আমরা যারা পড়ুয়া তারা মালবিকার মত অনিমিখে তাকিয়ে থাকব পথের দিকে। কে জানে অগ্নিমিত্র আসবেন কিনা!

আরো পড়তে পারোঃ

  1. Cantor's Diagonalization Argument
  2. Gromov Boundary
  3. Madhava-Gregory series

অসমীকরণ : সংখ্যাদের সম্পর্কের গল্প

(বাংলা মাধ্যমের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের একটু অন্যভাবে বা অন্যরকম অঙ্কের স্বাদ দেওয়ার জন্য দশটি লেখার একটি সিরিজ তৈরি করা হয়েছে । যার নাম দশকথা । আজ দশকথার চতুর্থ কথা। এই লেখাতে আমরা অসমীকরণ ব্যাপারটি বলব । আপনাদের মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য  চিন্তা গণিত কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে ।)

এই সিরিজের প্রথম , দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কথা

জ আমরা সম্পর্কের কথা বলব । আরও স্পষ্ট করে বললে সংখ্যাদের মধ্যেকার সম্পর্কের কথা বলব । শুনে অবাক হচ্ছো !! সংখ্যাদের মধ্যেকার সম্পর্ক!! আসলে তোমরা ব্যাপারটা জানো ।

আচ্ছা, এখন খানিকটা গল্প করি এসো । তুমি আর তোমার বাবার মধ্যে হল পিতা-সন্তানের সম্পর্ক। তুমি আর তোমার সহপাঠীর সম্পর্ক হল বন্ধুত্বের । জড়বস্তুদের মধ্যেও সম্পর্ক তৈরি করা যায় । এত হাসছ কেন? জড়বস্তুদের মধ্যে সম্পর্ক হয় শুনে !! নিচের ছবির দুটি পেন্সিলের দৈর্ঘ্য এক নয়, অর্থাৎ একটি অন্যটির চেয়ে দৈর্ঘ্যে ছোটো । আবার দেখো থলি ভর্তি তুলো , থলি ভর্তি পাথরের চেয়ে অনেক হালকা । আমরা একটা ব্যাপার বেশ বুঝতে পারছি যে, দুই বা ততোধিক বস্তুর মধ্য কোনো একটি ধর্মের (যেমন ছোটো না বড়, ভারী না হালকা, ভ্রাতৃত্ব না পিতৃত্ব) সাহায্যে সম্পর্ক তৈরি করা যায় ।


দুটি পেন্সিল

এইবেলা সংখ্যাদের সম্পর্কের কথা বলা যাক । কিন্তু মুশকিলটা হল, সংখ্যাদেরকে না স্কেল দিয়ে মাপা যায়, না পাড়ার মুদিখানার দোকানে ওজন করা যায় । অথচ পরিমাপের কাজে সংখ্যারা অপরিহার্য ।তাহলে সংখ্যাদের নিজেদেরক্ষেত্রে তাদের সম্পর্ক কি ভাবে প্রকাশ করা যায়? একদম !! তুমি ঠিকই ভাবছ । দুটো ১ যোগ করলে ২ হয়,তাহলে মানের হিসাবে ১, ২ এর চেয়ে ছোটো বা উল্টোভাবে বললে ২, ১ এর চেয়ে বড় । ৩ আর ৩.৫ মধ্যে তুলনা করলে বলা যায় ৩.৫ এর চেয়ে ৩ ছোটো (৩.৫=৩+০.৫)।

তোমরা এতদিন যে ধরনের সংখ্যা নিয়ে কাজ করেছ সেইগুলি সবই ধনাত্মক সংখ্যা । আরও একধরনের সংখ্যা আছে , সেগুলিকে ঋণাত্মক সংখ্যা বলে । যেমন -১, -২, -৭.৫ ইত্যাদি । তবে বলে রাখি, শূন্য(০) ঋণাত্মক বা ধনাত্মকের মধ্যে কোনটিই নয় । শূন্য যেন বাড়ির সদর দরজার মত । যে বাড়ির ভেতরের সাথে বাইরের যোগাযোগ রেখে চলেছে । অথচ সে নিজে না বাড়ির অন্দর, না বাড়ির বাহির । এই নতুন ধরণের সংখ্যাদের বুঝতে একটু অসুবিধা হচ্ছে তো ? ধরো তুমি তোমাদের পাড়ার দোকানে দু'টাকা নিয়ে চকলেট কিনতে গেলে, কিন্তু গিয়ে দেখলে চকলেটের দাম তিনটাকা হয়ে গেছে । তো তুমি একটাকা ধার রেখে চকলেট নিয়ে চলে এলে । বাড়িতে মা জিজ্ঞেস করল, আর কতটাকা জমা আছে? তুমি তো অবাক! জমা থাকবে কি ? উলটে তো ১টাকা ধার হয়ে গেছে । তুমি এই ১টাকা ধার ব্যাপারটাকেই ঘুরিয়ে বলতে পার যে -১টাকা জমা আছে ।

এই ঋণাত্মক সংখ্যাদের যোগবিয়োগ তোমাদের জানা ধনাত্মক সংখ্যাদের মতই । শুধু গুণের সময় দুটো কথা খেয়াল রেখো । দুটি ঋণাত্মক সংখ্যার গুণফল ধনাত্মক হয় । যেমন (-৩) $ \times $ (-২)=৬ । আর, একটি ঋণাত্মক ও একটি ধনাত্মক সংখ্যার গুণফল সবসমই ঋণাত্মক হয় । (-৩) $ \times $ (২)=(-৬) ।

এই ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা , ঋণাত্মক পূর্ণসংখ্যা , ধনাত্মক দশমিক সংখ্যা , ঋণাত্মক দশমিক সংখ্যা এবং
শূন্য - এরা একটি সংখ্যা পরিবারের সদস্য । যেই সংখ্যা পরিবারের নাম বাস্তব সংখ্যা পরিবার । যার এক একটি সদস্য হল একেকটি বাস্তব সংখ্যা ।

এবার আমরা এই বড়-ছোট সম্পর্ককে চিহ্নের সাহায্যে লিখে ফেলব । যেমন সমান বোঝাতে '=' চিহ্নটির সাহায্যে লিখে থাকি।"২, ১ এর চেয়ে বড় "- এটাকে চিহ্নের সাহায্যে লিখলে ব্যাপারটা গিয়ে দাঁড়ায় এইরকম "২>১" আর ১, ২এর চেয়ে ছোটো "১<২" । আমরা তাহলে সংখ্যাদের সম্পর্কের ব্যাপারে বলতে পারি যে, দুটি সংখ্যার মধ্যে তিন ধরণের সম্পর্ক হতে পারে
(i)প্রথম সংখ্যা > দ্বিতীয় সংখ্যা ,
(ii)প্রথম সংখ্যা < দ্বিতীয় সংখ্যা ,
(iii)প্রথম সংখ্যা = দ্বিতীয় সংখ্যা

এইখানে খেয়াল রেখো , দুটি সংখ্যার মধ্যে উপরের যেকোনো একটি-শুধুমাত্র একটিই সম্পর্ক সত্য হবে ।

এই চিহ্নগুলো অনেকসময় গুলিয়ে যায়, একটা মজার জিনিস দিয়ে খুব সহজেই মনে রাখা যায় । নিচের ছবিতে তীরের ফলার দিকে দেখো, সেটি খানিকটা আমাদের চিহ্নগুলির (<, >) মতো দেখতে । তীরের ফলার সূঁচালো দিকটি থাকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে, আর খোলামুখ থাকে তীরন্দাজের দিকে । সাধারণত লক্ষ্যবস্তু, তীরন্দাজের চেয়ে ছোট হয় ।এই ব্যাপারটাকে মাথায় রেখে সব সময় মনে রাখবে আমাদের চিহ্নগুলির সূঁচালো দিকে থাকা সংখ্যাটি, খোলা দিকে থাকা সংখ্যাটির চেয়ে ছোট হয় আবার উল্টো ভাবে বললে বলা যায় যে, খোলা দিকে থাকা সংখ্যাটি, সূঁচালো দিকে সংখ্যাটির চেয়ে বড় হয় ।

এবার কয়েকটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যাপারখানা বুঝে নেওয়া যাক । পাঁচজোড়া সংখ্যা নিলাম । (২,৮), (৫.৫, ৫) , (-৩,-১), (০,-৯৯) (৭, ৭)- প্রথম সংখ্যার সাপেক্ষে দ্বিতীয় সংখ্যার সম্পর্ককে চিহ্নের সাহায্যে লিখেফেলি ২<৮, ৫.৫>৫, -৩<-১, ০>-৯৯ এবং ৭=৭ । এই ঋণাত্মক সংখ্যাদের ছোটবড়-র নিয়ম ধনাত্মক সংখ্যাদের উল্টো হয় । অর্থাৎ ১, ২-এর থেকে ছোট হয় কিন্তু -১, -২-এর থেকে বড় হয় ।

এবার আমরা দুটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ধারণার কিসসা শুনব । চলো তাদের সাথে আলাপ সেরে নিই ।

তোমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, এইতো সেদিন পলাশডাঙার মাঠে হওয়া মেলাতে কত লোক এসেছিলো ? তুমি বলবে অনেক লোক এসেছিলো। কিন্তু অনেক লোক বলতে ঠিক কতজনকে বোঝানো হচ্ছে ? আসলে ব্যাপারটা এমন নয় যে লোকের সংখ্যা আমরা গুনতে পারতাম না । সেটা ১৫০০ বা ৪৩৭৫ হোক না কেনো !! এই "অনেক লোক" ব্যাপারটাকে ইংরেজি বর্ণমালার অক্ষরগুলির সাহায্যেও বলা যায় । তখন আমরা বলব সেদিন মেলাতে x জন লোক এসেছিলো । এই x এর মান ১৫০০ বা ৪৩৭৫, যা খুশি হতে পারে । এবার মনে হতে পারে এত অক্ষর থাকতে শুধুমাত্র x কেন ? a,b,c,d,... কেনও নয়? এখানে বলি তুমি যে কোনোও অক্ষরই ব্যাবহার করতে পার ।

আর একটা হল হয় এটা নয় ওটা, কিন্তু দুটোই একসাথে নয়। ধরো তুমি আমায় বললে "রবিবার দুপুর ২টোয় বাড়িতে অথবা মামারবাড়িতে থাকব" । তোমার বলা কথা থেকে আমি বুঝতে পারলাম যে, তোমার সাথে রবিবার দুপুর ২টোয় দেখা করতে চাইলে হয় তোমার বাড়িতে যেতে হবে না হলে মামারবাড়িতে । কারণ একই সময়ে তুমি দুটো জায়গায় থাকতে পারবে না ।

এবার উপরের দুটি ধারণার সাহায্যে সংখ্যাদের সম্পর্কের গল্পটা আরও জমিয়ে বলা যাক ।দুটি সংখ্যা নাও, ধরো a এবং b 
এবার আমি বললাম a,b এর চেয়ে ছোট অথবা সমান হবে । অর্থাৎ a<b অথবা a=b। এই পুরো জিনিসটাকে একটা নতুন চিহ্ন দিয়ে লিখব। সেটা হল \( a \leq b\) ।
a,b এর চেয়ে বড় অথবা সমান হবে । অর্থাৎ a>b অথবা a=b। আর সেটাকে চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করতে হয় \( a \geq b\) -এই ভাবে ।

এই রে!! এত গল্প করছি কিন্তু অসমীকরণ কাকে বলে সেটাই তো বলা হয়নি । সমান-এই শব্দ থেকে এসেছে সমীকরণ কথাটি । একটি উদাহরণের সাহায্যে জিনিসটা বলি । আমি বললাম আমার কাছে দু'টি চকলেট আছে। আরও কয়েকটি চকলেট কিনলে, আমার চকলেটের সংখ্যা তোমার চকলেটের সাথে সমান হবে। তোমার কাছে ছ'টি চকলেট থাকলে, আমাকে আর ক'টি চকলেট কিনতে হবে? তাহলে আগের মতো ধরে নিই আমাকে \(x\)টি চকলেট কিনতে হবে । এর সাথে আর ২টি চকলেট যোগ করলে যোগফল হবে ৬ । পুরো জিনিসটাকে আমরা এইভাবে লিখতে পারি x+২=৬ । এই শেষের বিস্তৃতিকেই সমীকরণ বলে । আর যেখানে সমান(=) চিহ্নের পরিবর্তে <,> , ≤ এবং ≥ ব্যাবহার করা হয়, সেই বিস্তৃতি কে অসমীকরণ বলে ।

এবার আমরা অসমীকরণের কয়েকটি বিশেষ ধর্ম জানব ।

(i) ধরা যাক \(x,y,z\) তিনটি বাস্তব সংখ্যা এবং \(x \leq y\) , তাহলে আমরা
বলতে পারি “\(x+z \leq y+z\)”- এই সম্পর্কটি সত্য |
(ii) ধরা যাক \(x,y ,z(z>0)\) তিনটি বাস্তব সংখ্যা এবং \( x \leq y\), তাহলে আমরা বলতে পারি “\( x \times z \leq y \times z\)”- এই সম্পর্কটি সত্য |
(iii)ধরা যাক \(x,y ,z(z<0)\) তিনটি বাস্তব সংখ্যা এবং যদি \( x \leq y\) , তাহলে আমরা বলতে পারি “ \( x \times z \geq y \times z\) ”- এই সম্পর্কটি সত্য |
(iv)ধরা যাক \(x,y,z\) তিনটি বাস্তব সংখ্যা এবং যদি \( x \leq y\) এবং \(y \leq z\) হয়,
তাহলে আমরা বলতে পারি “\(x \leq z\)” এই সম্পর্কটি সত্য |

একটি বিশেষ ধরনের অসমীকরণ

যদি x,y দুটি ধনাত্মক বাস্তব সংখ্যা হয় তাহলে, \( \frac{x+y}{2} \geq \sqrt{xy} \)

\(\sqrt{} \) চিহ্নটি হল বর্গমূলের । এটাকে অনেকটা ল্যাম্পপোস্টের মতো ভাবতে পার । তুমি যখন রাতেরবেলা ল্যাম্পপোস্টের নিচে হাঁটতে থাক, তখন তোমার সাথে তোমার ছায়াও থাকে । কিন্তু আসলে তো একটাই মানুষ । সেই রকমই বর্গমূলের চিহ্নের ভেতরে দুটো একই সংখ্যা থাকলে, বর্গমূলের চিহ্নটি তুলে দিয়ে একটি সংখ্যা লিখতে হয়। যেমন \(\sqrt{১৬} = \sqrt{৪ \times ৪}=৪ \) আবার \(\sqrt{২৫} = \sqrt{৫ \times ৫}=৫ \) । এখানে একটা কথা বলে রাখি, যেই সংখ্যার বর্গমূল বের করবে , সেটিকে মৌলিক উৎপাদকের গুণফল আকারে প্রকাশ করবে। দেখবে কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে । ধরো ১০০ র বর্গমুল বের করতে হবে , তখন \(\sqrt{১০০} =\) \( \sqrt{২ \times ২ \times ৫ \times ৫}=২ \times ৫=১০ \) ।

চেনা সমস্যার অচেনা সমাধান

উধো আর বুধো ঠিক করল, তারা ৩৬ বর্গমিটার জায়গাবিশিষ্ট আয়তকার (দৈর্ঘ্য≠প্রস্থ) জমিতে বেড়া দিবে । তারা ঠিক করলো ১/৪ অংশে বেড়া দেবে না, তো উধো আর বুধো পরিসীমার ১/৪ অংশ মাপতে শুরু করল । উধোর হিসেবে দাঁড়াল ৬.৫ মিটার, আর বুধোর হিসেবে ৫.৬ মিটার । এই হিসেব শুনে শ্রী কাক্কেশ্বর কুচকুচ বলল নিশ্চয় উধোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চেপেছে, তোরা কেউ একটা ভুল করেছিস হিসেবে । এখন তোমরা বলো কে হিসাবে ভুল করেছে?

চিন্তাসুত্র ১

ধরে নাও জমিটির দৈর্ঘ্য \(x\) মিটার, \(y\) মিটার, তাহলে পরিসীমা \(2(x+y)\) মিটার এবং ক্ষেত্রফল \(xy\) বর্গমিটার ।

চিন্তাসুত্র ২

আমাদের বিশেষ অসমীকরণ এখানে খুব কাজের ।

চিন্তাসুত্র ৩

পরিসীমার ১/৪ অংশ মানেই তো \(\ \frac{x+y}{2}\)

বহুভুজ :বন্ধুদের বিন্দু ভেবে দেখি


বাংলা মাধ্যমের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের একটু অন্যভাবে বা অন্যরকম অঙ্কের স্বাদ দেওয়ার জন্য দশটি লেখার একটি সিরিজ তৈরি করা হয়েছে । যার নাম দশকথা । আজ দশকথার তৃতীয় কথা। এই লেখাতে আমরা বহুভুজের ব্যাপারটি বলব । আপনাদের মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য  চিন্তা গণিত কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে ।)


এই সিরিজের প্রথম এবং দ্বিতীয় কথা

ভাবো তুমি খেলার মাঠে একা দাঁড়িয়ে । এখন এই ব্যাপারটি তুমি খাতায় এঁকে ফেলো । কি মনে হচ্ছে খুব কঠিন কাজ? মোটেই না! তোমার পেন্সিল দিয়ে খাতায় একটি বিন্দু এঁকে ফেলো । এবার ওই বিন্দুটির নাম দাও, নাহলে বুঝবে কি করে ওটা তুমি | কি নাম দেবে? আচ্ছা নাম দাও ‘আমি’ । নীচের ছবির সাথে একবার মিলিয়ে নাও ।

এবার ভাবো তুমি ও তোমার বন্ধু দাঁড়িয়ে আছো। এই ব্যাপারটা খাতার মাঠে এঁকে ফেলো। খাতার মাঠ? অদ্ভুত লাগছে শুনতে? আসলে আমাদের খাতার একটি পৃষ্ঠাকেই তো মাঠ বলে ভেবে নিয়েছি, না হলে খেলার মাঠের সমান অত্ত বড় পৃষ্ঠা পাবো কোথায়?  তুমি আর তোমার বন্ধুকে বিন্দু হিসাবে এঁকে ফেলো। বিন্দুদুটির নাম দাও। দুটি বিন্দুকে একটি রাস্তা দিয়ে জুড়ে দাও। নীচের ছবিদুটির সাথে একবার মিলিয়ে নাও ।

হঠাৎ করে তোমাদের এক বন্ধু তোমাদের সাথে যোগ দিল। সে তোমাদের সাথে সোজাসুজি না দাঁড়িয়ে এমনভাবে দাঁড়াল যাতে তোমার থেকে সে যত পা দূরে দাঁড়িয়ে, তোমার  আগের বন্ধুর থেকে সে ঠিক তত পা দূরে দাঁড়িয়ে।

তোমাদের তিন বন্ধুকে আবার আগের মত  বিন্দু হিসাবে এঁকে ফেলো। বিন্দুতিনটির নাম দাও। বিন্দুতিনটিকে একে অপরের সাথে রাস্তা দিয়ে জুড়ে দাও । নীচের ছবিগুলি লক্ষ্য কর, প্রথম ছবিটির মত বিন্দুগুলি নিলে হবে না ।

এই খেলা দেখতে পেয়ে এক বন্ধু তোমাদের সাথে যোগ দিল | তোমরা এখন মোট চার বন্ধু হলে | এখন নতুন বন্ধু তোমার দ্বিতীয়  বন্ধুর সাথে একই রেখায় দাঁড়াল | আগের মত বিন্দু হিসাবে এঁকে ফেলো | বিন্দুচারটির নাম দাও | বিন্দুচারটিকে চারটি রাস্তা দিয়ে জুড়ে দাও | নীচের ছবিগুলি লক্ষ্য কর |

তোমরা শুনেছ দুগ্গা ঠাকুরকে দশভুজা বলে । কেনো বলে জানো? ভুজ মানে হাত- এবার বুঝতেই পারছ দশভুজা কেনো বলে ।

আমাদের বানানো ছবিগুলোরও হাত বা বাহু আছে । ওমা ! হাসছো কেনো? ভাবছো পরোটা, চৌকো মতন জিনিসগুলোর হাত? আসলে এখানে বাহু বলতে এক একটা রাস্তাকে বোঝানো হয়েছে । বন্ধুদের সংখ্যা তিন বা তিনের বেশি হয়ে যাওয়ার সময় থেকে ছবিগুলি খেয়াল করলে দেখতে পাবে কিছুটা জায়গা রাস্তা বা বাহুগুলি দিয়ে ঘেরা আছে । এই ছবিগুলিকে বহুভুজ বলে ।

তিন বন্ধু যখন দাঁড়িয়েছিলে ,তখন একটি বহুভুজটি তৈরি হয়েছিলো । ওই বহুভুজটিকে বলা হয় ত্রিভুজ । কারণ এর তিনটি বাহু আছে । চারজনের ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া বহুভুজকে বলে চতুর্ভুজ।

হঠাৎ করে দেখলে এই খেলায় তোমাদের স্যার ও যোগ দিয়েছে। তাহলে তোমরা মোট পাঁচজন হলে। এখন আগের মত পাঁচজনকে বিন্দু হিসাবে ভাবো। তাদেরকে পাঁচটি রাস্তা দিয়ে জুড়লে ছবিটি কেমন হবে? আর নতুন বহুভুজটিকে কি নামে ডাকবে?

জাদু বর্গ

(বাংলা মাধ্যমের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের একটু অন্যভাবে বা অন্যরকম অঙ্কের স্বাদ দেওয়ার জন্য দশটি লেখার একটি সিরিজ তৈরি করা হয়েছে । যার নাম দশকথা । আজ দশকথার দ্বিতীয় কথা। এই লেখাতে আমরা ম্যাজিক স্কয়ার ব্যাপারটি বলব । আপনাদের মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য  চিন্তা গণিত কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে ।)

এই সিরিজের প্রথম কথা

ক্যাডবেরি খেতে তোমার কেমন লাগে? অন্য চকোলেটদের চেয়ে ক্যাডবেরি দেখতেও একটু অন্যরকম, তাই না !

প্রত্যেকটা খোপ বর্গাকার এবং একই রকমের দেখতে । এই খোপগুলোতে সংখ্যা বসিয়ে একটা দারুণ খেলা দেখানো যায় । এই রে! ভাবছ ক্যাডবেরিতে সংখ্যা বসিয়ে দিলে ওটা তো আর খাওয়া যাবে না । ঠিক আছে, তাহলে ক্যাডবেরিটা খেয়েই নাও । আমরা বরং খাতা-কলমে খেলাটা খেলি।

প্রথমে আমি তোমাকে খেলাটা দেখাই । নিচের ছবির মত একটা বর্গাকার ছক খাতায় এঁকে ফেলো।

এখানে মোট ৯ টি খোপ রয়েছে । এবার আমাদের ১ থেকে ৯ পর্যন্ত সংখ্যাগুলিকে এমনভাবে বসাতে হবে যাতে খোপগুলিতে বসানো সংখ্যাদের সোজাসুজি(উল্লম্বভাবে),পাশাপাশি(অনুভূমিকভাবে) এবং কোণাকুণি(কর্ণ বরাবর) যোগফল সমান হয় । অনুভূমিকভাবে থাকা খোপগুলিকে সারি এবং উল্লম্বভাবে থাকা খোপগুলিকে স্তম্ভ বলা হয় ।

এই খেলার আর একটা নিয়ম আছে, তুমি কোনও সংখ্যাকে একবারই ব্যাবহার করতে পার ।

এই জিনিসটার খুব সুন্দর একটা নাম আছে- জাদু বর্গ । এইবার দ্যাখো খেলার খেলার নিয়ম মেনে  ১ থেকে ৯ পর্যন্ত সংখ্যাগুলিকে একবারই ব্যাবহার করে  সোজাসুজি, পাশাপাশি এবং কোণাকুণি যোগফল ১৫ পেয়েছি । এই ১৫ কে বলা হয় জাদু ধ্রুবক

ধ্রুবক ব্যাপারটা বুঝলে না তো ?

বছরের যে সময়েই দ্যাখো না কেন দেখবে রাতের আকাশে ধ্রুবতারা একই জায়গাতে রয়েছে । অর্থাৎ সন্ধ্যাতারা বা শুকতারা যেমন বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেখতে পাওয়া যাই, ধ্রুবতারা কিন্তু সারা বছরজুড়ে একই  অবস্থানে দেখতে পাওয়া যায় । সেইরকমই জাদু বর্গের সোজাসুজি, পাশাপাশি এবং কোণাকুণি যোগফল ধ্রুবতারার মতো স্থির অর্থাৎ একই হয় ।

আমার দেখানো জাদু বর্গকে বলে ৩x৩ ক্রমের জাদু বর্গ | এই  “৩x৩ ক্রম” ব্যাপারটি বুঝিয়ে বলা যাক | এখানে দ্যাখো ৩ টি সারি এবং ৩ টি স্তম্ভ আছে | এই ব্যাপারটাকেই ৩x৩ ক্রম বলে । এটার সাহায্যে আমরা বলে দিতে পারি মোট ক’টা খোপ আছে - যেমন ৩x৩ ক্রমের জাদু বর্গে ৯ টি খোপ থাকে । এই ৯ টি খোপে প্রথম  ৯ টি স্বাভাবিক সংখ্যাকেই (১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮, ৯) ব্যাবহার করেছি |

জাদু বর্গের আরেকটি জাদু ব্যাপার হল, “উল্টে দেখুন একই আছি” , অর্থাৎ স্তম্ভ বরাবর সংখ্যাগুলিকে সারি বরাবর লিখলেও নতুন বর্গটিও জাদু বর্গ হয় । জাদু ধ্রুবক একই থাকে ।

এবার দ্যাখ ৩x৩ ক্রম জাদু বর্গের জাদু ধ্রুবক ১৫, কিন্তু ৪x৪, ৫x৫  ক্রমের জাদু ধ্রুবকও কি ১৫ হবে?

জাদু ধ্রুবক সব ক্রমের জন্যে একই হয় না । জাদু ধ্রুবক নির্ণয় করার একটা কৌশল আছে । এইখানে একটা জিনিস খেয়াল করার মতো , সেটা হল জাদু বর্গে যতগুলি সারি থাকে ঠিক ততগুলিই স্তম্ভ থাকে । যেমন আমার দ্যাখানো জাদু বর্গে  ৩ টি সারি আর ৩ টি স্তম্ভ আছে । কিন্তু ৩ টি সারি আর ৪ টি স্তম্ভবিশিষ্ট জাদু বর্গ বানানো সম্ভব নয় । অর্থাৎ সারির সংখ্যা ও স্তম্ভের সংখ্যা সমান না হলে জাদু বর্গ তৈরি করা  সম্ভব নয় । কারণটা তুমিই খুঁজে দেখো । আমি একটা ছোট্ট সুত্র দিই কারনটা খোঁজার জন্যে । জাদু বর্গ - এই “বর্গ” শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে কারনটা ।

এবার  জাদু ধ্রুবক বের করার কৌশলটি বলি ।

দেখবে তাহলেই জাদু ধ্রুবক পেয়ে যাবে ।

৩x৩ ক্রমের জন্যে জাদু ধ্রুবকের মান ১৫ হচ্ছে কিনা একবার পরখ করে দেখ ।

এই ধরণের জাদু বর্গকে সাধারণ জাদু বর্গ  বলে । এবার তোমরা ৪x৪ ক্রমের সাধারণ জাদু বর্গ বানানোর চেষ্টা করো ।

এবার তোমাকে “জন্মদিনের জাদু বর্গ ”-এর কথা বলব । আমাদের দেশের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ শ্রীনিবাস রামানুজন তাঁর নিজের জন্মদিন দিয়ে এই জাদু বর্গ বানিয়েছিলেন। এই জাদু বর্গ সব সময় ৪x৪ ক্রমের হয় ।

রামানুজনের জন্মদিন হল ২২-১২-১৮৮৭(২২ শে ডিসেম্বর, ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দ ) |

এখানে দ্যাখো, সারি,স্তম্ভ, কর্ণ বরাবর যোগফল ১৩৯|শুধু তাই নয়,নিচের ছবিগুলি লক্ষ্য কর, চারটি ক্ষেত্রেই রঙিন অংশগুলির যোগফলও ১৩৯ ।

এখানে আর একটি ব্যাপার লক্ষ্য করার, সাধারণ জাদু বর্গের মতো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সংখ্যা নেওয়া হয়নি অর্থাৎ ৩x৩ ক্রমের জন্যে ১ থেকে ৯ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল- এইক্ষেত্রে সেইসব বাধানিষেধ নেই । শুধু খেয়াল রেখো কোনো সংখ্যা দু’বার ব্যবহার করা যাবে না ।

এবার তুমি নিজের জন্মদিনের জাদু বর্গ বানিয়ে পাঠিয়ে দাও ।

প্রথমে জাদু ধ্রুবক বের করে নাও । যেমন  রামানুজনের জন্মদিনের জাদু বর্গের জাদু ধ্রুবক হল ১৩৯ (২২+১২+১৮+৮৭=১৩৯) । তারপর প্রথম সারির চারটি খোপে দিন-মাস-শতক-বছর(উদাঃ ২২-১২-১৮-৮৭) বসিয়ে দাও । তারপর জাদু বর্গ বানিয়ে নাও ।  

আয়নাবাজি

(বাংলা মাধ্যমের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের একটু অন্যভাবে বা অন্যরকম অঙ্কের স্বাদ দেওয়ার জন্য দশটি লেখার একটি সিরিজ তৈরি করা হয়েছে । যার নাম দশকথা । আজ দশকথার প্রথম কথা। এই লেখাতে আমরা দর্পণ প্রতিসাম্যতা ব্যাপারটি বলব । আপনাদের মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য  চিন্তা গণিত কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে ।)

নেকদিন আগে এক রাজকুমারী ছিল | তাঁর মনে ভারী দুঃখ ছিল | সে রাজা, গজা, মন্ত্রী, সান্ত্রী সব্বাইকে দেখতে পেলেও, সে যে নিজে কেমন দেখতে তাই কোনোদিন দেখেনি |

ওমা! তুমিও কি একই কথা চিন্তা করছ? অন্য সবাই কে দেখতে পেলেও নিজেকে দেখতে পাও না?

রাজকুমারী পড়েছে মহা সমস্যায় | দিন যায়, রাত যায়- সে ওই একই কথা চিন্তা করতে থাকে | এমন সময় এক দূরদেশের ব্যবসায়ী ওই দেশে এসেছিল | সে লোকের মুখে রাজকুমারীর এই সমস্যার কথা শুনল | এর কিছুদিন পরে সে রাজদরবারে গিয়ে জানাল, তাঁর কাছে এমন এক অদ্ভুত জিনিস আছে যা দিয়ে নিজেকে দেখা যায় |

তোমরা বলতে পারবে জিনিসটা কি?---

 একদম ঠিকই ধরেছো, "আয়না" | আয়নাতে আমরা নিজেদেরকে দেখতে পাই | এদিকে রাজকুমারী তো আয়না নিয়ে ভারী খুশি | কিন্তু তাতেও সে একটা ছোট্ট মুশকিলে পড়ে গেল| আয়নাতে সব কিছু কেমন উল্টো উল্টো লাগছে ।

কি হল? তোমরা কিছু ভাবছ কি ?

ওহো ! বুঝতে পেরেছি ওই “উল্টো উল্টো” ব্যাপারটা  নিয়ে ভাবছ তো? তোমরা হয়ত অনেকেই আয়নাতে নিজেদেরকে দেখে থাকবে  এখন যারা দেখছ তারা হয়ত ভাবছ কই, কিছু উল্টোয় না তো ! একই থাকে!

কিন্তু আমাদের রাজকুমারী যে উল্টো উল্টো দেখছে বলল? তাহলে কি সে ভুল দেখছে?

আসলে উল্টে যাওয়া বলতে কিন্ত পড়ে যাওয়া নয় নীচের ছবিগুলি লক্ষ্য করো

প্রথম ছবির হনুমান যদি আয়নায় নিজেকে দেখে,  সে কিন্তু দ্বিতীয় ছবির মত উল্টোনো হনুমান দেখবে না |

তোমরা একটা  আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, দেখবে তোমার ডান হাত , আয়নাতে দেখতে পাওয়া তুমির বাম হাত হয়ে গেছে|  

বুঝবে কি করে ?

আচ্ছা, তুমি ডানহাতে একটা পেন্সিল নাও | এখন দেখবে আয়নাতে পাওয়া তুমির বাম হাতে পেন্সিল আছে |

আর একটা পরীক্ষা করে দেখতে পারো |  তোমরা প্রত্যেকে একটা কাগজে নাম লেখো| এইবার আয়নার সামনে গিয়ে ওই লেখাটা ধরো দেখবে অক্ষরগুলো কেমন উল্টেপাল্টে গেছে |

ব্যাপারটা হল গিয়ে, ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল!!

আমরা এই খেলাটার নাম দিলাম আয়নাবাজি |

এইবার তোমরা নিজেদেরকে রাজা রাণীর মতো ভাবতেই পারো | আমি জানি, আসলে তো তোমরা তাই-ই...

এইবার তোমরা আয়না না দেখে বল তো, নীচের দেওয়া ইংরাজী অক্ষরগুলির মধ্যে কোনগুলি আয়নাবাজিতে উল্টে যাবে ? আর কোনগুলি একইরকম থেকে যাবে ?

B,  O, G, U, R, D, H, K